এলএনজি আমদানি

স্পটনির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উৎসে ঝুঁকছে সরকার

দেশের গ্যাস দিয়ে স্থানীয় চাহিদা পূরণ না হওয়ায় ২০১৮ সাল থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করে সরকার। ওমান ও কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও আনা

দেশের গ্যাস দিয়ে স্থানীয় চাহিদা পূরণ না হওয়ায় ২০১৮ সাল থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করে সরকার। ওমান ও কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও আনা হচ্ছে এ জ্বালানি। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম পরিবর্তনশীল হওয়ায় কোনো কারণে তা বেড়ে গেলে বিপদে পড়তে হয় বাংলাদেশকে। তাছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কেনা হয়, সেগুলো নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উৎস থেকে এলএনজি আমদানির দিকে ঝুঁকছে।

সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদের সভাকক্ষে গতকাল অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় ব্রুনাইয়ের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এলএনজি কেনার বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। জিটুজি ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদে ব্রুনাই এনার্জি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেডিং এসডিএন বিএইচডির (বিইএসটি) কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় তা কেনা হবে। এছাড়া আরো বেশকিছু দেশ থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানিটি আমদানির বিষয়ে কাজ করছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

অর্থ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও ব্রুনাইয়ের মধ্যে এলএনজি সরবরাহ সহযোগিতার বিষয়ে ২০১৯ সালের ২২ এপ্রিল একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তী সময়ে এর মেয়াদ বাড়ানো হয় পাঁচ বছর। স্বাক্ষরিত এমওইউর আলোকে এ বছরের ১০ মে ব্রুনাই সরকার মনোনীত প্রতিষ্ঠান বিইএসটি ১০ বছর মেয়াদে প্রতি বছর ১২-১৮ কার্গো এলএনজি (বছরে শূন্য দশমিক ৭৫ থেকে ১ দশমিক ২৫ মিলিয়ন টন) সরবরাহের প্রস্তাব করে। কারিগরি কমিটি ব্রুনাইয়ের প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তির বিভিন্ন শর্ত নিয়ে দরকষাকষি করে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এতে সম্মতি দিয়েছেন। এ অবস্থায় দেশের বিদ্যমান ও ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটানো এবং বিদ্যুৎ, সার, শিল্পসহ অন্যান্য খাতে গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য জিটুজি ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদে ব্রুনাই থেকে পিপিএ ২০০৬-এর ৬৮ ধারা মোতাবেক সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় এলএনজি কেনার প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি তাতে অনুমোদন দেয়।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি একেবারে বন্ধ করা সম্ভব না হলেও এক্ষেত্রে নির্ভরতা কমাতে চাইছে সরকার। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি আমদানিকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ব্রুনাইয়ের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এলএনজি আমদানির বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ব্রুনাইয়ের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দ্রুতই আলোচনা করে এলএনজির দাম নির্ধারণসহ অন্যান্য শর্ত নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে দেশটি থেকে এলএনজি আমদানি বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হলে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়া হবে। সরকার চাইছে এ বছরের মধ্যেই এটি চূড়ান্ত করতে। সরকার বর্তমানে জিটুজি, পিপিপি ও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে এলএনজি আমদানি করতে চায়। দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানির জন্য নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া, সৌদি আরব ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও আলোচনা করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্রুনাই থেকে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা পেট্রোবাংলার রয়েছে। প্রাথমিক কার্যক্রম হিসেবে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত কমিটিতে নীতিগত অনুমোদন হয়েছে। এখন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা করা হবে।’

বাংলাদেশ ২০১৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর কাতার এনার্জি এবং ২০১৮ সালের ৬ মে ওমানের ওকিউটির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানির চুক্তি করে। এর মধ্যে কাতার এনার্জির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছর এবং ওকিউটির সঙ্গে ১০ বছর। কাতারের প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে বছরে ১ দশমিক ৮ থেকে ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন এবং ওমানের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বছরে এক-দেড় মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানির কথা রয়েছে। এর পাশাপাশি ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে স্পট মার্কেটের মাধ্যমেও এলএনজি আমদানি শুরু হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে শুরু করে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আগস্ট পর্যন্ত কাতার এনার্জি থেকে ২৪০ কার্গো এবং ওকিউটির কাছ থেকে ১১৪ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। অন্যদিকে ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে শুরু করে চলতি অর্থবছরের আগস্ট পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে কেনা হয়েছে ৬৯ কার্গো এলএনজি। সব মিলিয়ে দেশে এখন পর্যন্ত ৪২৩ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছে।

সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির গতকালের সভায় স্পট মার্কেট থেকে দুই কার্গো এলএনজি আমদানিরও অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভিটল এশিয়া প্রাইভেট লিমিটেডের কাছ থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ১৪ দশমিক ১৩ ডলার হিসাবে এক কার্গো এলএনজি আমদানিতে বাংলাদেশী মুদ্রায় ব্যয় হবে ৬৬৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪২ হাজার ৭২০ টাকা। একইভাবে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কাছ থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ১৪ দশমিক ৫৭ ডলার হিসাবে এক কার্গো এলএনজি আমদানিতে মোট ৬৮৭ কোটি ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৮০ টাকা ব্যয় হবে।

এলএনজি আমদানির বিপরীতে প্রতি বছর বড় অংকের অর্থ গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বিশেষত ডলার সংকটের কারণে এলএনজি আমদানির ব্যয় পরিশোধে বড় ধরনের চাপে পড়তে হয়েছে। পেট্রোবাংলার নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে এলএনজি কেনায় ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। স্পট মার্কেট থেকে এনএলজি কিনতে নগদ ডলার ব্যয় করতে হয়। তাছাড়া আসন্ন শীত মৌসুমে বিশ্বব্যাপী এলএনজি চাহিদা বেড়ে যাবে এবং এতে জ্বালানিটির মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি কেনা হলে সেক্ষেত্রে বিলম্বে দাম পরিশোধের সুযোগ থাকে। তাছাড়া দাম নির্ধারিত থাকায় যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিক মূল্য পরিশোধ থেকেও রেহাই পাওয়া যায়। এসব দিক বিবেচনায় সরকার এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি উৎসকে প্রাধান্য দিতে চাইছে।

আরও